পৃষ্ঠাসমূহ

মায়া পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মায়া পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

মায়া :রহস্যময় এক গোপন সভ্যতা (পর্ব ৫)

সম্ভবত এই কারনেই স্পেনীয় হানার প্রতিরোধ করে মায়ারা আরো জঙ্গলে আত্মগোপন করেছিলো।এই মহামারীর ভয়েই মায়ারা বাইরের সমাজে মেলামেশা করত না,নিজেদের গন্ডীর বাইরে পা বাড়াতো না।স্পেনীশদের সংগে আসা বসন্ত রোগ ছড়িয়ে পড়েছিলো মায়াদের মধ্যে।তবে মায়ারাও স্পেনীয়দের সংগে সিফিলিসের পরিচয় করিয়ে দিয়ে এক অর্থে প্রতিশোধই নিয়েছিলো।যা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ছড়িয়েছিল ইউরোপ ও এশিয়ায়।
সাম্প্রতিককালে মায়া মমির ডাক্তারি পরীক্ষা করে দেখা গেছে ,বহু মায়াজনপদধ্বংস হয়েছিলো বিভিন্ন রোগের আক্রমনে।এর মধ্যে বিজ্ঞানীদের ধারনাযৌন রোগই প্রধান।এই পরীক্ষার ফল জানার পর কিছু মার্কিন বিশেষজ্ঞরা তত্ত্ব খাড়া করেছেন যে,অসুখ বিসুখই মায়া সভ্যতার পতনের কারন।কিন্তু ইতিহাস পড়ুয়ারা জানেন,মধ্য ও দক্ষিন আমেরিকার আজটেক সহ অন্যান্য অধিবাসীদের মধ্যে যৌন রোগের যথেষ্ঠ প্রকোপ ছিল।কিন্তু তারা এসবের মধ্যেই ঘর বাধতে অভ্যস্ত ছিল।এই রোগে তারা নির্বংশও হয়নি।তাহলে শুধুমায়া জনপদেই এই রোগ এত ভয়ংকর হয়ে দেখা দিয়েছিলো কেন?
৭০০-১০০০ খ্রীষ্টাব্দকালে টোলটেক ও আজটেকরা মায়াদের সংস্পর্শে আসতে শুরু করে।অদ্ভুত ব্যাপার ঠিক ওই সময়েই একের পর এক মায়া জনপদ রহস্যজনকভাবে জনমানবশূন্য হতে থাকে।টোলটেক ও আজটেকদের কাছে যা ছিলো সাধারন রোগ,তাকে মায়াদের এত ভয় পাওয়ার কারন কি?কিছু কিছু বিশেষজ্ঞদের ধারনা মায়ার মধ্য আমেরিকা বা এই পৃথিবীর অধিবাসী নয়।সেই কারনেই এই গ্রহের রোগ জীবানু প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাদের শরীরে ছিলো না।মানুষের সংস্পর্শে আসা মানেই,নতুন রোগের সংক্রমন,ফলে মহামারীর আশঙ্কা।এই বিপদ সম্পর্কে আশঙ্কা বা সচেতনতাই মায়াদের প্রতিবেশীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে বাধ্য করেছিলো
প্রাচীন মায়া ঐতিহ্য ও প্রতিবেশী জনগোষ্ঠীর কিংবদন্তীতে এমন অনেক প্রমান রয়েছে যে,সংক্রামক রোগের বিপদসম্পর্কে মায়ারা যথেষ্ট সচেতন ছিল।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান উন্নত জ্ঞানও প্রযুক্তি সম্পন্ন মায়ারা প্রতিবেশী জনগোষ্ঠীর কাছে দেবতা বা মহাপ্রভুর আসন পেয়েছিল।আমেরিকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলির কিংবদন্তীতে পাওয়া যায়,এই ‘দেবতা’ তাদের উন্নত করেছিল।কিন্তু ‘দেবতারা’ আহার্য্য গ্রহন করতেন না।তাঁরা যখন দেখা দিতেন তখন তাঁদের মাথায় থাকত শিরস্ত্রান এবং পরনে অদ্ভুত পোষাক যাতে সংক্রামক রোগ তাদের আক্রমন করতে না পারে।
মায়াপুরানে রয়েছে ‘সোনালী সাদা বজরা দানা থেকে ঈশ্বর নিখুঁত মানুষ গড়লেন।তারা চোখ মেলতেই পৃথিবী দেখতেপেল।তাদের দৃষ্টিপথে,সুদূর আকাশ থেকে পাতাল পর্যন্ত দৃশ্যমান হল।কোনস্থান পরিবর্তন ছাড়াই তাদের গোটা পৃথিবী দেখার ক্ষমতা ছিল।মহত্‍ ঞ্জানের অধিকারী হয়ে তারা নদী,নালা,পর্বত,সমুদ্র ও অরন্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।তারা ছিল যাযাবর।এরাই আমাদের পূর্বপুরুষ।’
এত কিছুর পরও একটা অমীমাংসিত থেকেই যাচ্ছে। কারা এই অতিমানব সৃষ্টি করেছিল?এরা কি মহাশূন্য থেকে আসা বীজ থেকে সৃষ্টিজাত?মায়ালিপির সম্পূর্ন পাঠোদ্ধার হলে হয়তো এর উত্তর পাওয়া যেতে পারে।আর্ন্তনাক্ষত্রিক অভিযাত্রীরাযে পৃথিবীতে এসেছিলেন মায়াপুরানে যেন সেই ইঙ্গিতই রয়েছে।পোপালভূতে রয়েছে,’তারা সর্বজ্ঞানী ছিলেন।তারা মহাকাশের চর্তুদিক পর্যবেক্ষন করেছিলেন।সেখান থেকেই গোলাকার পৃথিবীকে নিরীক্ষন করেছিলেন।’এই রহস্যময় জাতির পুরান,সংস্কৃতি,চিকিত্‍সা বিঙান সবকিছুতেই যেন বহির্বিশ্বের ছোঁয়া।গুয়েতেমালা থেকে শুরু করে উত্তর মধ্য আমেরিকা,এশিয়ায় যে মায়া আবেশ ছড়িয়েছে তার উত্‍স যেন সত্যি হেথা নয়,অন্য কোথাও,অন্য কোনোখানে।

মায়া :রহস্যময় এক গোপন সভ্যতা (পর্ব ৪)

মায়ারা মৃতব্যাক্তির সমাধিতে তার ব্যাবহার্য্য সবকিছু রেখে দিতো।একই পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সমাধিস্থ করা হতো।রাজ পরিবারের কেউ মারা গেলে তাকে বিশেষ মর্যাদায় সমাধি দেয়া হতো।সমাধির পাশে তারা রঙিন পাথরের ফলক রেখে দিতোযাতে মৃত্যুর দিনক্ষন লেখা থাকতো।গবেষকদের মতে মায়াদের কবর ছিলো ক্যাপসুলের মত।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা শহরগুলো থেকে মাঝে মাঝে এমন কিছু জিনিস খুঁজে পান যা সত্যি অসাধারন এবং অবিশ্বাস্য।ক্যারাকলের মতো কোপানের দালান গুলোর নীচেও কিছু নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়।প্রত্নতত্ত্ববিদ রিকার্গে আগারকা কোপানে কাজ করছেন ১৯৭৮ সাল থেকে।তিনি বলেন,আমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে মায়ানদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো তা খুঁজে বের করা।গত চার বছরে আগারকা একটি পিরামিড আকৃতির মন্দির খনন করে বের করেছেন যা মায়াদের জীবন যাপন সম্পর্কে কিছুটা ধারনা দেয়।কোপানের ১৬ নম্বর মন্দিরটিকে এটার আকৃতির জন্য প্রধান মন্দির বলে ধারনা করা হয়।মন্দিরগুলো ছিলো তাদের সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান এবং শহরের সবচেয়ে উঁচু ভবন।পিরামিড আকৃতির এই মন্দিরগুলোর ভেতরটা পুরোপুরি ঢালাই করে বন্ধ করা।যখন আগারকার কর্মীরা মন্দিরের ঢালাই ভেঙ্গে ফেললো তখন গোলকধাঁধার মতো একটি টিউব আকৃতির টানেল তৈরী হলো।টানেলটি বেশ রহস্যজনক।বাইরে থেকে মন্দিরের ভেতরটা বেশী বড় না হলেও মাঝে মাঝেই কর্মীরা টানেলের ভেতর রাস্তা হারিয়েফেলে।
মন্দিরগুলোর ভিতরে অদ্ভুত কিছু দেয়াল রয়েছে যা মন্দিরে ছাড়া আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায়নি।দেয়াল জুড়েটানা অনেকগুলো মুখোশ আঁকা রয়েছে।ধারনা করা হয় এগুলো তাদের দেবতাদের কল্পিত প্রতিবিম্ব।মন্দিরের প্রবেশমুখে দুটি দৈত্যাকার পাখির মুখোশ বসানো রয়েছে পূর্ব দিকে মুথ করে।চোখ ধা ধা করা রঙ আর নিঁখুত সব পেইনটিং সমৃদ্ধ মন্দিরগুলো বর্তমান সভ্যতাকে যেন বুড়ো আঙুল দেখায়।….
১৫১৯ সালের ৪ মার্চ ভেরাক্রজে অবতরন করেছিলেন স্পেনীয় দলপতি কোর্টেজ।ওই বছরেই কিউবা থেকে ধরে আনা এক নিগ্রো ক্রীতদাসের শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল ভয়ংকর বসন্ত রোগ।আমেরিন্ডদের কাছে অপরিচিত এই রোগ।এর প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাদের শরীরে ছিল না।আজটেকদেরমোট জনসংখ্যার অর্ধেকই মারা পড়েছিল।১৫৩১ সালে বিজেতারা উপহার দিয়েছিল আর এক মহামারী।এবার সম্ভবত হাম।১৫৪৫ সালে মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাইফয়েড।লাসকালাতে দেড় লক্ষ এবংচোলুলাতে এক লক্ষ অধিবাসীর মৃত্যু হয়।১৫৬৪,১৫৭৬,১৫৮৮ এবং ১৫৯৫ সালে একের পর এক মহামারীতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।

মায়া :রহস্যময় এক গোপন সভ্যতা (পর্ব ৩)

বর্তমানে মায়ারা এখনো নাছোড়বান্দার মতো আগলে রেখেছে তাদের অনেক পুরোনো সংস্কৃতিকে।চিয়াপাস এবং গুয়াতেমালার উচ্চভূমিতে বসবাস করছে মায়াদের একটি জনপদ।তাদের নিজস্ব ঢঙের পোষাক শুধু মায়া বংশধর হিসেবে স্বীকৃতিই দেয়না বরং ইংগিত দেয় একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের যেখানে তারা হাজার বছর থেকে বসবাস করে আসছে।
প্রবাদ আছে,মায়ান নারীরা যখন তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘হুইপিল’ ব্লাউজ পড়ে তখন তাদের মাথা পৃথিবীর দিকে নুয়ে থাকে যেমন ফলবান বৃক্ষ নুয়ে থাকে।ম্যাক্সিকোর উচ্চভূমি চিয়াপাসে মায়া গবেষক চিপ মরিস দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বস্ত্রবুননকারী মায়াদের নিয়ে কাজ করছেন।তিনি বলেন,মায়ানরা মনে করে তাদের পোষাকের কারুকায একই রকম ভাবে চলে আসছে যেমনটা তাদের সভ্যতার শুরুতে ছিলো।তিনি আরো বলেন,যখন আমি ওদের ভাস্কর্য,স্ট্যাচুএবং তাদের পরিহিত বস্ত্র নিয়ে গবেষনা করি তখন তাদের বস্ত্রের কারুকাজের সাথে ধ্বংশ হয়ে যাওয়া নিদর্শনের হুবহু মিল খুঁজে পাই।তাদের কারুকাজ এতটাই নিজস্ব যে পৃথিবীর আর কোনো হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার সাথে মিল নেই।মায়ানরা দাবী করে,তাদের এই কারুকাজ,প্রকৌশল,স্থাপত্য কলা কোনো মানুষের মস্তিষ্ক থেকে আসে নি বরং তারা এগুলো তাদের স্বপ্নের মাধ্যমে ঈশ্বর থেকে পেয়েছে।মায়ানরা বিশ্বাস করে তারা যেখানেই বসবাস করুক না কেন ঈশ্বর সেখানেই করুনা বর্ষন করেন।দেবদূতরা নিয়োজিত আছেন বৃষ্টিপাত,সূর্যালোক আর ফসলের রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে।
তারা বিশ্বাস করে পবিত্রতা একটি অতিন্দ্রেয়ীয় ব্যাপার,এমন কিছু যা আমরা সচরাচয় দেখি কিন্তূ তার চেয়েও বেশি কিছু।তাদের পিরামিড আকৃতির মন্দিরগুলো পবিত্র পর্বতের নির্দেশ দেয় যেখানে তাদের পূর্বপুরুষদের আত্মা ঘোরাফেরা করে।দরজা গুলো নির্দেশ করে পবিত্রভূমি এবং নরকের রাস্তা হিসেবে।মায়ানরা বিশ্বাস করে তাদের মৃত্যুর পর তারা শিবলবা (Xibalba) নামক নরকে পতিত হবে।শিবলবাএমন একটি জলপূর্ন রাজত্ব যেখানে রোগব্যাধি অপেক্ষা করে থাকে।কোপান শহর থেকে ১৩০ মাইল উত্তরে ক্যারাকল নামক এক ধ্বংশপ্রায় মায়া শহরে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিলো মায়ারা মৃত্যুকে কীভাবে বিবেচনা করতো এটা জানার জন্য।একসময় ক্যারাকল সমৃদ্ধশালী প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিলো।এখানে একটি কোর্ট পাওয়া যায় যেখানে বসে মায়ান রাজা রাজ্য পরিচালনা করতো।বর্তমানে গবেষকদের কাছে ক্যারাকল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্নকারন এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমাধি পাওয়া গিয়েছে।আর্লেন চেইজ একজন পটার (Potter) এবং তার স্ত্রী ডায়ান চেইজ একজন কঙ্কালবিধ।তারা দুজন চেষ্টা করছেন মৃত্যু সম্পর্কে মায়ারা কী ভাবতো এটা বের করার জন্য।
আর্লেন বলেন,আমরা সবসময় পশ্চিমা ধ্যানধারনা নিয়ে মায়ানদের বিচার করি।কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে মায়ারা এমন একটা জাতিগোষ্ঠী ছিলো যাদের সাথে ইউরোপ বা অন্য কোথাকার প্রাচীন সভ্যতার কোনো মিল নেই।মায়ারা তাদের আত্মীয় স্বজনদের মৃতদেহ একটা ঘরের মধ্যে সমাধি দিতো।মায়ারা মৃতব্যাক্তির সমাধিতে তার ব্যাবহার্য্য সবকিছু রেখে দিতো।একই পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সমাধিস্থ করা হতো ।

বৃহস্পতিবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৩

মায়া :রহস্যময় এক গোপন সভ্যতা (পর্ব ২)

কোপান শহরকে ঘিরে ছিলো ধীর গতির একটাআঁকাবাঁকা নদী আর পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরী সুদৃশ্য দালান গুলো গড়ে ওঠেছিলো জংগলের সমতলে।অত্যান্ত চমত্‍কার ভাবে রঙ করা দালান গুলোর মাঝখানে সাদা রঙ করা সেন্ট্রাল প্লাজা থাকতো যেখানে হাজার হাজার মানুষ একসাথে জড়ো হতে পারতো।এখানে জীপজন্তুর চামড়া,কচ্ছপের খোলক,কোকো বীন,তামাক,ঘোড়া এবং পশম কেনাবেচা হতো।শহরের ঠিক মাঝখানে বিশাল জায়গা জুড়ে বল খেলার জায়গা ছিলো।বলগুলো পাথরের তৈরী ছিলো।এই বলখেলার নিয়ম ছিলো ভয়াবহ।দুইপক্ষের মধ্যে খেলা হতো।বলটি হাত পা কোনটা দিয়ে ধরা যেত না।শুধু কোমর দিয়ে একপক্ষ অপর পক্ষের দিকে ধাক্কা মারতো যতক্ষন বল গতি না হারায়।খেলোয়াড়রা খেলার সময় মাথায় বেল্ট বেঁধে রাখতো।অনুমান করাহয় যে পক্ষ হেরে যেতো তাদের পরিনতি খুব খারাপ হতো এবং ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলি হতো।তাদের বিশ্বাস ছিলো এতে প্রকৃতি তাদের সহায় হবেন এবং ভালো ফসল ঘরে আসবে।
অত্যন্ত গোপন এই মায়া সভ্যতার মানুষেরা মনে করতো ঈশ্বরই সকল প্রানের উত্‍স এবং একমাত্র ঈশ্বরেরইক্ষমতা আছে তাদের সাথে মধ্যস্থতা করার।তারা বিশ্বাস করতো ঈশ্বর মিশে আছেন সূর্য আর বৃষ্টির মাঝে আর মানুষযা চায় ঈশ্বর তাই দেন।মায়ারা বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে রক্ত উত্‍সর্গ করতো।তাদের ধারনা ছিলো আত্মার সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগেরএকমাত্র মাধ্যম রক্ত।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন অনুষ্ঠানে রাজা নিজের রক্ত উত্‍সর্গ করতেন।এটা মায়াদের অত্যন্ত গোপন একটি আচার ব্যাবস্থা ছিলো।এই রক্তদানে ঈশ্বরের করুনার দরজা খুলে যেতো।তারা রক্ত পুড়িয়ে ধোঁয়া সৃষ্টি করতো এবং মনে করতো এই ধোঁয়ার মধ্যেই ঈশ্বরের দর্শন পাওয়া সম্ভব।…
আজও মায়াদের বংশধররা বেঁচে আছে এবং তারা তাদের জীবনাচার সেভাবেই সাজিয়েছে যেভাবে তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলো।তারা বংশানুক্রমে তাদের অতীত মনে রেখেছে এবং অল্প কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া তাদের আচার অনুষ্ঠান পূর্বপুরুষদের মতোই পালন করে।তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ঈশ্বর পুনরায়তাদের আগের সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দিবেন।ক্যাসিমিরাহো সাগাজাউ একজন মায়ান পুরোহিত।তিনি ফসল উৎপাদনের সময় ঈশ্বরের আরাধনায় নিয়োজিত থাকেন।তিনি বলেন,আমরা মায়ানদের সরাসরি বংশধর।আমরা হাজার বছর ধরে আমাদের ধর্ম পালন করে আসছি।আমি ছোট বেলায় আমার বাবা মায়েয় কাছ থেকে ধর্মীয় আচার ব্যাবস্থা শিখেছি।আমাদের স্বপ্নে ঈশ্বর জানিয়েদেন কখন বীজ বপন করতে হবে,কখন ফসল তুলতে হবে,কখন আগুন জ্বালাতে হবে আর কখনই বা শষ্য উত্‍সব করতে হবে।
আজ থেকে ৫০০ বছর পূর্বে এক স্প্যানিশধর্মযাজক প্রথম ইয়োকেটানের মায়ানদেরআচার ব্যাবস্থা সম্পর্কে পুস্তক লিখেছিলেন।তার বই মায়ানদের ধর্ম সম্পর্কে জানতে সাহায্য করেছে।যখন ক্যাথলিক চার্চ আইন করে মায়ানদের পূজা অর্চনা বন্ধ করে তখন থেকে তাদেরআচার ব্যাবস্থাগুলো বিলুপ্ত হতে থাকে।বর্তমানে মায়ান বংশধররা যে ধর্ম পালন করছে তা আসলে তাদের মূল ধর্ম নয় বরং ক্যাথলিক আর মায়া ধর্মের ডোপিং।

মায়া :রহস্যময় এক গোপনসভ্যতা (পর্ব-১)

কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করেন তারও এক হাজার বছর আগে তাদের উত্থান,যখন প্যারিস ছিলো নিতান্তই সাধারন একটা গ্রাম।তারা জংগল কেটে কেটে আধুনিক শহর তৈরী করেছিলো,তারা পাথর দিয়ে বানানো বল দিয়ে এক অদ্ভুদ খেলা খেলত যা তাদের বেঁচে থাকা বা মারা যাওয়া নির্ধারন করতো।তারা তাদের রক্ত বিসর্জন দিতো নিজেদের মঙ্গলকামনায়,তারা জীবন সাজাতো কল্পিত স্বর্গকে অনুসরন করে।তাদের লেখাগুলো ছিলো এক রহস্যময় পাজল যা মানুষ এখনো বুঝতে পারেনি।শেষ পর্যন্ত মানুষ জানতে পারলো কারা ছিলো তারা।তারা ছিলো সেই সব মানুষ যারা মনে করতো ঈশ্বর তাদের শষ্যদানা থেকে সৃষ্টি করেছে।তারা মায়া।
আমেরিকান পর্যটক নাম জন লয়েড ষ্টিফেনএক নৌ অভিযাত্রায় এসে মায়া সভ্যতা খুঁজে পান যার নাম কোপান।তখন পর্যন্ত মায়া সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা ছিলোনা।ষ্টিফেন অনেক কিছু খুঁজে পেলেন।হাজার বছর ধরে মাইলের পর মাইল মাটির নীচে চাপা পড়েছিলো নিদর্শনগুলো।ষ্টিফেন অভিভূত হয়েছিল মায়া রহস্য দেখে।কে তৈরী করেছিলো এই শহর?কী হয়েছিলো এখানে?এই সমযটুকুতে ষ্টিফেন এবং এক ইংরেজ চিত্রকর ফ্রেডরিক কেটারউড ধ্বংশ হয়ে যাওয়া এই শহরে বর্ননা প্রাথমিকভাবে লিপিবদ্ধ করেন।তিন বছর পর ষ্টিফেন এবং কেটারউড উত্তরখন্ডে মায়ার আরো একটি শহরের খোঁজ পান,নাম ইয়োকাটান।ইয়োকাটানে তারা উক্সমাল এবং চিচেন ইটজা ঘুরে দেখেন।চিয়াপাস নামক জায়গায় গিয়ে তারা খুঁজে পান ‘পালানকে’ নামক আরো একটি মায়া শহর।তখনো তাদেরকে একটি প্রশ্নই বিদ্ধ করতে লাগলো,কারা ছিলো এই অভাবনীয় উন্নত সভ্যতায়?
মায়া সভ্যতার বিস্তৃতি হন্ডুরাস থেকে শুরু হয়ে এল সেলভেডর এবং দক্ষিনে গুয়েতেমালা থেকে বিলিজ এবং উত্তরে মেক্সিকো পর্যন্ত।মায়া সভ্যতা মোট একশোটি সভ্যতার নিদর্শন প্রকাশ করে এবং প্রত্যেকটি সভ্যতারইরয়েছে নিজস্ব ইতিহাস।মায়াদের মূলভূখন্ডকে বিশেষজ্ঞরা ‘ক্লাসিক’ বলেন এবং তা দক্ষিনের নিম্মভূমিতে অবস্থিত।এটাই সেই জায়গা যাকে ঘিরেই আমার আজকের এই লেখা।
প্রথমে শুরু করবো ‘কোপান’ থেকে।এখন কোপানকে আগের মতো সাজিয়ে তোলার কাজ চলছে।বিল ফ্লাশ কোপান পুর্নগঠনের দায়িত্ব থাকা একজন পরিচালক।তিনি বলেন-কোপান হচ্ছে মায়াদের তৈরীকৃত সবচেয়ে জাকজমকপুর্ন।এটা খুবই তাত্‍পর্যপূর্ন কারন এটা মায়াদের সবচেয়ে বড় শহর।অবশ্য এরচেয়েও বড় শহর অনাবিষ্কূত থাকতে পারে।কোপানে এমন কিছু অবিশ্বাস্য কারুকাজ,ভাস্কর্য,শিল্পকলা,প্রকৌশলাও জ্যার্তিবিদ্যার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে যা মায়াদের উন্নত জাতিসত্বারস্বীকৃতি দেয়।কোপান প্যারিসের মতই একটি সাংস্কৃতিক শহর ছিলো।
প্রতিবছর কয়েকশ কর্মী এবং বিশেষজ্ঞরা চেষ্টা করছেন কোপানকে আগের মতো সাজিয়ে তুলতে।পাথরের পর পাথরে গড়ে তোলা এই কীর্তির গল্প এখনোঅজানা।একেকটা ভাস্কর্য্য তৈরী করতে ব্যাবহার করা হয়েছিলো ত্রিশ হাজারেরও বেশী পাথরের ব্লক।কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য কোনো নকশা না থাকাতে বিশেষজ্ঞদের বেশ কষ্ট হচ্ছে।তারা ক্ষয়ে যাওয়া নিদর্শনগুলো থেকে প্রকৃত কাঠামো অনুমান করে কাজ চালাচ্ছেন।কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও ফ্যাশের বিশেষজ্ঞ দল প্রায় এক হাজার ভাস্কর্য্য এবং দশটি দালান আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।এক হাজার পূর্বে কোপান কেমন ছিলো তা প্রতি বছরই স্পষ্ট থেকেস্পষ্টতর হচ্ছে।
ক্লাসিক মায়ারা ধাতু ব্যাবহারে বেশ নিরুত্‍সাহী ছিলেন।তাবা মাটি,পাথর,গাছের গুড়ি দিয়ে তৈরীকৃত জিনিসপত্র ব্যাবহার করতো।এজন্যই শহরগুলোতে কোনো স্বর্ন বা স্বর্নজাতীয় ধাতু পাওয়া যায়নি।১৯৯২ সালে রবার্ট শেরার কোপানে মায়া রাজপরিবারের একটি সমাধি খুঁজে পান।সমাধিতে পাওয়া গেলো কিছু পাথরেরতৈরী পাত্র।এই পাত্রগুলো খুবই গুরুত্ব বহন করে এদের গায়ে আঁকা অভূতপূর্ব চিত্র আর সাংকেতিক লেখাগুলোর জন্য।8০ বছর আগে মায়াবিদরা অল্প কিছু মায়া সংকেত পড়তে সক্ষম হন।এখন তারা প্রায় অর্ধেক মায়া সংকেত পড়তে পারেন।ডেভিডস্টুয়ার্ট একজন বিশ্ববিখ্যাত মায়াবিদের সন্তান এবং বিশ্বের শীর্ষসাংকেতিক বর্নবিদ।তিনি উদ্ধারকৃত সাংকেতিক লেখা সংবলিত পাত্রগুলো নিয়ে গবেষনা করে বলেন -মায়ারা বেশ জাকজমকপূর্ন ছিলো এবং তাদের জীবন ছিলো নানা আচার ব্যাবস্থায় পরিপূর্ন।এক ধরনের মায়া লেখা চিরতরেহারিয়ে যায়।১৬শ শতকে যখন স্প্যানীশ ধর্মযাজকেরা যখন এখানে আসেন তখন তারা প্রায় একশ বাঁধাই করা বই(কোডেসিস) খুঁজে পেয়েছিলেন।কিন্তুতারা এগুলো পুড়িয়ে ফেলেন।
আজ মাত্র চার প্রকার কোডেসিস টিকে আছে,কিন্তু এই চারটি কোডেসিসই সাহায্য করছে সত্যিকারের মায়াদের সম্পর্কে জানতে।জ্যার্তিবিদ্যা সর্ম্পকিত কিছু বই পাওয়া যায় যাতে প্রমানিত হয় জ্যার্তিবিদ্যা সম্পর্কে মায়ারা বেশ আধুনিক ধারনাই রাখতো।সাধারন কিছু গানিতিক গননায় তারা বের করতে পারতো হাজার বছর আগে এবং হাজার বছর পরে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান কেমন হবে।তারা জানতো বিশ্ব ব্রম্মান্ড অসংখ্য ছোট বড় গতিশীল গ্রহের সমন্বয় এবং পৃথিবী বৃত্তাকারপথে ঘুরছে।এমনকি তারা সূর্যগ্রহনের দিনক্ষন আগে থেকেই বলে দিতে পারতো।তারা তাদের আচার অনুষ্ঠান গুলো সময়ের সাথে সাজাতে পারতো।মায়ারা পাথরের পাতলা প্লেটে তাদের গুরুত্বপূর্ন আচার অনুষ্ঠানেরদিন তারিখ লিপিবদ্ধ করে রাখতো।এই প্লেটগুলো বড় বড় পাথরের ব্লকে সাঁটানো থাকতো আর এই ব্লক গুলো একটারপর একটা বসিয়ে উঁচু সিঁড়ির স্তম্ভ্য তৈরী করা হতো।একেকটা ব্লক একেকটা সংকেত ধারন করতো।এই স্তম্ভ্যগুলোর কিছু কিছু অংশ এখনো রয়ে গিয়েছে।বারবারা ফ্যাস একজন ভাস্কর্য্যবিদ।তিনি প্রায় বারশো সংকেত লিপিবদ্ধ করেন।একদিন হয়তো এই সংকেত গুলোই বলে দিবে কি ছিলো কোপান শহরের ইতিহাস।
কিছু সংকেত এগুলোর আকৃতির জন্য সহজেইবোধগম্য।যেমন মায়ারা গাছ বোঝাতে আস্ত একটা গাছই এঁকে রাখতো।একটি পাথরের সংকেত থেকে জানা যায় কোপানের প্রথম রাজা ছিলেন ২০০ খ্রীষ্টাব্দে।প্রথম রাজার অভ্যুত্থানেরও অনেক আগে মায়ারা উর্বর কোপান ভ্যালীতে বাস করতো।তারাতাদের জীবনকে প্রকৃতির নিয়মে সঁপে দিতো,তারা গাছ লাগাতো,ফসল ফলাতো,জন্মোত্‍সব করতো আবার মৃত্যু পরবর্তী অনুষ্ঠানও করতো।কিন্তু ৪০০ খ্রীষ্টাব্দে যখন রোম বিভক্ত হতে শুরু করে তখন এই জনপদেও পরিবর্তন আসে।